শেরপুর জেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলাধীন এবং ময়মনসিংহ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত মধুটিলা রেঞ্জের সমেশচূড়া বিটের প্রায় একশ হেক্টর পাহাড়ি বনভূমি নিয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে মধুটিলা ইকোপার্ক প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে।

সৌন্দর্য পিপাসু লোকজনের জন্য বিনোদনের দ্বার উন্মুক্ত করেছে এই ইকোপার্কটি। নিঝুম দ্বীপের মতো এখানে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। পাশেই আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুড়া পাহাড়। রকমারি জীবের প্রতিকৃতিসমৃদ্ধ ইকোপার্কটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়ঘেরা পরিবেশ সত্যিই মুখরিত- আনন্দিত হওয়ার মতো।

ইকোপার্কের প্রধান ফটক পেরুতেই চোখে পড়বে বন্যপ্রাণী হাতির ভাস্কর্য। এ যেন বাস্তবরূপে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক পা বাড়ালেই চোখে পড়বে লেকের কোণে কুমারী মৎস্যকন্যা আর লেকে বেড়ানোর পানিতে ৩টি প্যাডেল বোট ও ৫টি দেশীয় নৌকা।

ঘুরে আসুন শেরপুরের মধুটিলা ইকোপার্ক থেকে
ঘুরে আসুন শেরপুরের মধুটিলা ইকোপার্ক থেকে

পাহাড়ি ঝরনাধারার পানি এসে মিশেছে লেকের পানিতে। কালভার্টের ডানে রয়েছে হালকা নাস্তা চা-কফিসহ স্টেশনারি সামগ্রীর দোকান। একটু এগোলেই মনোরম স্টার ব্রিজ, যা লেকের পানির উপর নির্মিত। একসঙ্গে শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে-বসে উপভোগ করা যায় বনভোজনের আড্ডা। পাশেই রয়েছে কৃত্রিম কুমির। দেখতে বাস্তব মনে হবে। এরপর বিস্তর এলাকায় ক্ষণে ক্ষণে চোখে পড়বে বিভিন্ন পশুপাখির ভাস্কর্য। স্থানে স্থানে রয়েছে বসার স্থান।

উঁচু পাহাড় কেটে ঢালু রাস্তা তৈরি করা হয়েছে রেস্টহাউজে যেতে। প্রাইভেট-মাইক্রো চলার উপযোগী খাঁজকাটা পাকা রাস্তার মাঝের সারিতে রয়েছে নানা রঙের পাথর বসানো এক শিল্পকর্ম যাতে পা পিছলে না যায়। আর উপর-নীচ থেকে দাঁড়ালে মনে হবে বাহারি ফুলের সারি।

দু’পাশে রয়েছে জীববৈচিত্র্যের প্রতিকৃতি। ভাস্কর্যগুলো দেখলে মনে হবে যেন শিল্পীর হাতের নিখুঁত চিত্র। রেস্টহাউজের বাঁকা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির মনোমুগ্ধ পরিবেশ। উঁচু-নীচু পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে মনে হবে পানির ঝরনাধারা আর এরই নিচে রয়েছে লেক। আসলে সেগুলো পাহাড়ে ওঠার রাস্তা। কিছুদূর ঘুরে এসে বিশ্রাম করুন রেস্টহাউজে।

উপভোগ করুন রেস্টহাউজের আধুনিক সুযোগ সুবিধা। তারপর খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার বেরিয়ে পড়–ন পাহাড় থেকে পাহাড়, অন্য পাহাড়ে। জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর ভাস্কর্য আর প্রকৃতির সঙ্গে মিতালী করে ক্যামেরায় ছবি তুলুন চেনা অতীতকে স্মৃতি করে। ফেরার পালায় সময় পেলে যেতে পারেন নিকটবর্তী বারমারি মিশন বা খ্রিস্টান মিশনে। এটিও জেলার আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। আবার মধুটিলার অতি নিকটেই রয়েছে বৃহত্তর জেলার অন্যতম পর্যটক কেন্দ্র গজনী অবকাশ কেন্দ্র, যা ইতিমধ্যেই সারাদেশে অত্যাধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেখতে পাবেন আদিবাসী গারো, হাজং, কোচ, হদি বর্মণ সম্প্র্রদায়ের অধিবাসীদের। গারো পাহাড়ের গজারি বনের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তায় গাড়ি চালানোর রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো আপনি উপভোগ করতে পারেন।

খাওয়া-দাওয়া নিয়ে চিন্তার তো কোনো অবকাশই নেই বরং মনকে প্রফুল্ল রাখতে আছে টাটকা খাবারের সুব্যবস্থা। মধুটিলা ইকোপার্কে ঢুকতে প্রবেশ মূল্য দু’জন যাত্রীসহ মোটরসাইকেল ২০, বড় বাস ৫০০, মিনিবাস ২০০ ও লোকাল বাস ৪৫০ টাকা। এর ভিতরে রয়েছে ছোট একটি চিড়িয়াখানা। আর রয়েছে অসম্ভব সুন্দর একটি কৃত্রিম লেক এবং একটি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার।

মধুটিলা ইকোপার্ক গেটের বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে বাঁয়ে ১০০ গজ এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে ৫৫ ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ারের। পাহাড়ের উঁচু টিলায় নির্মাণ করা হয়েছে এটি। ওয়াচ টাওয়ারের উপর দাঁড়িয়ে উপভোগ করবেন প্রকৃতির মজা, নিস্তব্ধ-নীরবতা। যেন এক নিথর বাতায়ন।

সর্বত্রই যেন সবুজের রাজ্য। দেখবেন সামান্য দূরে অবস্থিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুড়া পাহাড়। মূল্যবান ও বিরল উদ্ভিদ। টাওয়ারে ওঠার টিকিট ৫ টাকা। এখানে দাঁড়িয়ে খালি চোখে আবছা আবছা ভারতের বিএসএফ ক্যাম্প দেখা যায়। আবার পরিষ্কারভাবে দেখতে চাইলে টাওয়ারে বাইনোকুলার রয়েছে। দূরবিনে ভারতের ক্যাম্প দেখতে ১০/২০ টাকা লাগে।

পাহাড়ের চূড়ায় সাইট ভিউ টাওয়ারে উঠলেই চোখ জুড়িয়ে যায় সীমান্ত পেরিয়ে উঁচু উঁচু পাহাড় আর সবুজ অরণ্যের মনোরম দৃশ্য দেখে। দূরের অরণ্যকে একটু কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হলেও এর সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। ভাগ্য ভালো হলে ওয়াচ টাওয়ার থেকেই মিলতে পারে বুনোহাতির দলের দেখা। তারা সাধারণত শেষ বিকেলে অথবা সন্ধ্যায় গভীর অরণ্য থেকে নেমে আসে।

গারো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে যত দূর এগোনো যায়, ততই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমারোহ। টাওয়ার থেকে ডানদিকে এগোলে উঁচু পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটি এত খাড়া যে, এটাতে কেউ একবার উঠলে বসে একটু বিশ্রাম না নিলে হাঁফিয়ে উঠতে হবে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়বে অত্যাধুনিক বন বিভাগের রেস্ট হাউস। এখানে ভ্রমণপ্রিয়দের দিনের বেলায় ব্যবহারের জন্য রয়েছে পাহাড়ের চূড়ায় মহুয়া রেস্টহাউস। এ রেস্ট হাউস থেকে নেমে আসার পথে চোখে পড়বে শিশুদের জন্য শিশুপার্ক।

এ ছাড়া এখানে রয়েছে ডিসপ্লে মডেল, তথ্যকেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং জোন, ক্যানটিন, মিনি চিড়িয়াখানা। ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক প্রজাতির বৃক্ষ, মৌসুমি ফুলসহ বিভিন্ন রঙের গোলাপের বাগান। রয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পটও। পার্কটিতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীর সমাহারও চোখে পড়বে। সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত থাকতে পারবেন এখানে। সপ্তাহে সাতদিন খোলা।

পর্যটন সুবিধাদির মধ্যে আছে পনের একর শোভাবর্ধনকারী ও বিরল প্রজাতির বনায়ন। বিশ একর বনভূমিতে রয়েছে ঔষধি প্রজাতির বনায়ন, রেস্টহাউজ, বাসগৃহ। চার রুমবিশিষ্ট অত্যাধুনিক রেস্টহাউজ। বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতি হিসেবে রয়েছে ২টি হাত, ২টি বাঘ, মৎস্যকন্যা, ঈগল, হনুমান, প্যাঁচা, সাপ, কুমির, হরিণ, ক্যাঙ্গারু, ব্যাঙ, সিংহ। অবকাঠামোগত কাজের মধ্যে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, ১টি স্টার ব্রিজ, পাবলিক টয়লেট, বসার স্থান। লেকের পানিতে চরে বেড়ানো আর ব্যবহারের জন্য রয়েছে কয়েকটি দেশীয় নৌকা। বর্তমানে ইকোপার্কটি দর্শনার্থী-পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

বিনা পয়সায় পর্যটন কেন্দ্রটি ঘুরে বেড়ানোর জন্য প্রতিনিয়তই ভিড় বাড়ছে। কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে এসে অনেকেই উপভোগ করছে অনাবিল আনন্দ। শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রতিদিন ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা আসছে লোভনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনে। ঘুরে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের পর পাহাড়। চিত্তবিনোদনের জন্য রয়েছে বিশাল পরিসর।

যেভাবে আসবেনঃ

ঢাকা থেকে মধুটিলা ইকোপার্কের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে শেরপুরে আসতে হবে। ভাড়া ২০০-২৫০ টাকা। শেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী বাজার পর্যন্ত লোকাল বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া ২০-৩০ টাকা। নন্নী বাজার থেকে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ভাড়ায় পাওয়া যায়। শেরপুর থেকে ভাড়ায় মাইক্রোবাস, অটোরিকশা অথবা মোটরসাইকেলে মধুটিলা ইকোপার্কে আসা যাবে। অথবা ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি নালিতাবাড়ী পর্যন্ত গেটলক সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া ২৫০-২৮০ টাকা। নালিতাবাড়ী থেকে অটোরিকশা, মোটরসাইকেলে ২০-২৫ মিনিটে মধুটিলায় যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দিনে এসে দিনেই ফিরে যাওয়া যায়। তবে ইচ্ছে করলে শেরপুর শহরে বিভিন্ন হোটেলে করতে পারেন রাত্রি যাপন।

Leave a Reply