শেরপুর, ভারতের মেঘালয়ের কোল ঘেষা ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলা। পূর্বে (১৮২৯-২০১৫ পর্যন্ত) জেলাটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে পৃথক হয়ে শেরপুর জেলা গঠিত হয়। যার আয়তন ১ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার ও ২০১১ আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা ১৩ লক্ষ ৩৪ হাজার জন। জেলাটি ছোট হলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত এ অঞ্চলে রয়েছে নানা ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান। যা ভ্রমণ পিপাসুদের দৃষ্টি কাড়বে।

মসজিদ, জমিদার বাড়ি, মন্দির ছাড়াও জেলাটিতে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থান। এছাড়া অবকাশ কেন্দ্র, পাহড়ে ঘেড়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ইকো পার্ক, রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা, নয়াবাড়ির টিলা, পানিহাটা-তারানি পাহাড় ও সুতানাল দীঘির মতো রয়েছে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। ঢাকা থেকে সড়কপথে দিনে গিয়ে দিনে ঘুড়ে আসতে পারেন আপনিও।

দর্শনীয় স্থান

মধুটিলা ইকোপার্ক
ঢাকা থেকে মধুটিলা ইকোপার্কের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুরে আসতে হবে। শেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ভাড়ায় মোটরসাইকেল ছাড়াও বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে সহজেই পৌঁছা যায় প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা এই ইকোপার্কটি। এছাড়াও ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি নালিতাবাড়ী পর্যন্ত গেটলক সার্ভিস রয়েছে। নালিতাবাড়ী থেকে অটোরিকশা, মোটরসাইকেলে ২০-২৫ মিনিটে মধুটিলা ইকোপার্কে যাওয়া যায়।
মধুটিলা ইকোপার্কের ওয়াচ টাওয়ার থেকে ভারতের মেঘালয়

গজনী অবকাশ কেন্দ্র
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ে পর্যটন গজনী অবকাশ কেন্দ্র। শেরপুর থেকে আনুমানিক দূরত্ব ৩০ কি.মি। জেলা শহর থেকে গজনী অবকাশ পর্যন্ত রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের মসৃণ পিচঢালা পথ। ফলে সড়ক পথে যাতায়ত খুব সহজ।

ঢাকা থেকে সরাসরি মাইক্রোবাস অথবা প্রাইভেট কারে গজনী অবকাশ যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে নিজস্ব বাহনে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা এছাড়া ঢাকার মহাখালি থেকে বাসে শেরপুর আসা যায়। বাস ভাড়া ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। শেরপুর থেকে লোকাল বাস, টেম্পু অথবা সিএনজি চালিত অটোরিকশায় সহজেই যাওয়া যায় গজনী অবকাশ কেন্দ্রে।

রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা
দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাসে বা যে কোনো যানবাহনে আসা যায় শেরপুর শহরে। এখান থেকে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদীর কর্ণঝোরা বাজার। বাস, টেম্পুসহ যে কোনো যানবাহনে আসা যায় মনোমুগ্ধকর নয়ানিভিরাম স্থান রাজার পাহাড় থেকে বাবেলাকোনায়। পাশেই রয়েছে অবসর কেন্দ্র। রাত হলে সেখানে থাকার জন্য রয়েছে নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসিক ভবন। কম খরচে, কম সময়ে এ গারো পাহাড় আপনাকে দেবে অনাবিল আনন্দ।

নয়াবাড়ির টিলা
শেরপুর শহর থেকে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদী উপজেলা।

পানিহাটা-তারানি পাহাড়
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার এবং শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এ দর্শনীয় স্থানটি। ঢাকা থেকে শেরপুর জেলা শহরে না এসেই নকলা উপজেলা শহর থেকেই নালিতাবাড়ী হয়ে সহজেই যাওয়া যায়।

সুতানাল দীঘি
জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার আড়াইআনী বাজার হতে সুতিয়ারপাড় বাজার হয়ে শালমারা রাস্তায় যাওয়া যায়। টেম্পু, অটোরিক্সা বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থান

মাই সাহেবা মসজিদ
আনুমানিক ২৫০ বৎসর পূর্বে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। জেলার প্রাচীন নিদর্শনের এটি একটি। বক্রাকারে খিলানের ব্যবহার এবং সুউচ্চ মীনার ২টি সত্যি দৃষ্টিনন্দিত। স্থাপত্য কলার আধুনিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এই মসজিদটিতে। এটি শেরপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে শেরপুর সরকারি কলেজর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে অবস্থিত। শেরপুর শহরের প্রবেশের সময় এর মিনার দুটি অনেক দূর থেকে দেখা যায়। শেরপুর শহরে প্রবেশের পর যে কারো এই মসজিদটি দৃষ্টি কাড়বে।

গড়জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদ
স্থাপত্য নিদর্শনের অন্যতম বারো দুয়ারী মসজিদ। জনশ্রুতিতে আনুমানিক ৭-৮ শত বৎসর পূর্বে জরিপ শাহ নামক এক মুসলিম শাসক নির্মিত করেছিল এ মসজিদটি। মসজিদটির ইটের ধরণ কৌশলে খান বাড়ী মসজিদের ইটের সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে।প্রাচীন রীতির সঙ্গে আধুনিক রীতির সংমিশ্রণে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে -যা সহজেই দর্শকদের মন জয় করে। অপরূপ সুন্দর এই মসজিদটি আসলে পুরাকীর্তির নিদর্শন। ১২টি দরজা থাকায় এর নামকরণ করা হয় বারো দুয়ারী মসজিদ।

অপূর্ব কারুকাজ সম্বলিত মেহরাব ও কার্ণিশগুলো সকলের দৃষ্টি কাড়ে। এছাড়াও কিছু দূরে জরিপ শাহ এর মাজার অবস্থিত। এর অদূরে রয়েছে কালিদহ সাগর। চাঁন্দ সওদাগরের ডিঙ্গা ডুবেছিল এখানেই। অঞ্চলটিতে একবার ঘুরে এলে যে কোনো চিন্তাশীল মানুষকে ভাবিয়ে তুলবে।

পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি
জমিদার সত্যেন্দ্র মোহন চৌধুরী ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বাড়িকে বলা হত ‘পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি’। গ্রীক স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত স্থাপত্যটি এখনো অক্ষত অবস্থার সাক্ষ্য বহন করছে জমিদারী আমলের। বাড়িটির নির্মাণকাল গোপীনাথ মন্দির নির্মাণেরও অনেক পূর্বে। সুপ্রশস্ত বেদী, প্রবেশ প্রবেশদ্বারের দুই প্রান্তে অনেকগুলো অলংকৃত স্তম্ভ। স্তম্ভগুলোর নিচ থেকে উপর পর্যস্ত কারুকাজ খচিত নকশা। কার্ণিশেও বিভিন্ন প্রকারের মটিভ ব্যবহার করা হয়েছে। আস্তরণ ও পলেস্তারে চুন ও সুড়কীর ব্যবহারও লক্ষণীয়। ছাদগুলোতে গতানুগতিকভাবে লোহার রেলিংয়ের সঙ্গে রয়েছে চুন সুড়কীর ঢালাই।

গোপী নাথ ও অন্ন পূর্ন্না মন্দির
জমিদার সত্যেন্দ্র মোহন চৌধুরী ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরী ১৭৮৩ সালে এটি নির্মাণ করেন। স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন এই মন্দিরটি। পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট মন্দিরটি পদ্মস্তম্ভ দ্বারা দন্ডায়মান। স্তম্ভ শীর্ষে ও কার্নিশে ফুল ও লতা পাতার নকশা সম্বলিত এক অপরূপ স্থাপত্য। দক্ষিণ ও পূর্ব পার্শ্বে উপরের কার্নিশে রাজকীয় মুকুটবিশিষ্ট তাজিয়া স্থাপন করা হয়েছে যা মৌর্য যুগের স্থাপত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এছাড়া ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদ, রং মহল, লোকনাথ মন্দির ও রঘুনাথ জিওর মন্দির, জিকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী স্থার রয়েছে এই জেলাটিতে।

এছাড়া ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদ, রং মহল, লোকনাথ মন্দির ও রঘুনাথ জিওর মন্দির, জিকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী স্থার রয়েছে এই জেলাটিতে।

হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট
১. হোটেল সম্পদ প্লাজা (আবাসিক), যোগাযোগ- ০৯৩১-৬১৭৭৬
২. কাকলী গেস্ট হাউজ (আবাসিক), যোগাযোগ- ০৯৩১-৬১২০৬
৩. বর্ণালী গেস্ট হাউজ (আবাসিক), যোগাযোগ- ০৯৩১-৬১৫৭৫
৪. আরাফাত গেস্ট হাউজ (আবাসিক), যোগাযোগ- ০৯৩১-৬১২১৭
৫. শাহী খানা খাজানা, যোগাযোগ- ০৯৩১-৬১৬৪৭
৬. হোটেল শাহজাহান, যোগাযোগ-০১৯১১৪১১৭৭১

এছাড়া রয়েছে জেলা পরিষদ ডাক বাংলো।

Leave a Reply